My Pages~আমার পাতা

এখানে আমার লেখা কবিতা, গল্প ইত্যাদি পাবেন।

গর্ব আমার, স্বর্গ আমার , আমার মাতৃভাষা
স্বপ্ন আমার, আশা আমার, আমার ভালবাসা

P25

ও বৈশাখ

P26


S1

প্রেমপত্র.

সুভাষ চট্টোপাধ্যায়

          করোনার তৃতীয় ঢেউ একটু স্তিমিত হতেই মনটা আনচান করে উঠল। পায়ের তলার সর্ষেগুলো নড়াচড়া করতে শুরু করলো। দূরে না হলেও কাছে পিঠে কোথাও কয়েকদিন ঘুরে আসতেই হবে। কিন্তু সব জায়গাতেই ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই‘ অবস্থা। অবশেষে, অনেক কষ্টে শান্তিনিকেতন ট্যুরিস্ট লজে একটা কটেজ পেয়ে আর কিছু না ভেবে ট্রেনে চেপে সোজা বোলপুর।

            যাক বাবা, আর ঘোরাঘুরি নয়। ক’দিন চুটিয়ে আরাম আর খাওয়া। নিরিবিলি লজটা এর জন্য আদর্শ। চারপাশে সুন্দর মরশুমী ফুলে সাজানো লনের মাঝখানে ছাতার নীচে পাতা টেবিলের পাশের চেয়ারগুলোর একটায় বসে পড়লাম। আমাকে একা বসে থাকতে দেখে পাঞ্জাবি পাজামা পরিহিত একজন অতি বয়স্ক ব্যক্তি হাসিমুখে দ্রুতপায়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমিও হাসি বিনিময় করে তাঁকে পাশের চেয়ারে বসতে অনুরোধ করলাম। প্রাথমিক পরিচয়ের পর আলাপ জমে উঠল। এই বয়সেও  ভদ্রলোকের স্মার্ট চলাফেরা আমাকে তাঁর সম্পর্কে কৌতুহলী করে তুলল; কারণ, আমি নিজে সত্তর ছুঁইছুঁই বয়সে হাঁটুর ব্যথায় খুবই কাতর।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সত্তর ছাড়িয়েছেন নিশ্চয়ই?‘

ভদ্রলোক হা-হা করে হেসে উঠে বললেন, ‘সত্তর? বলেন কী মশাই? এইটি রানিং – আশি চলছে।‘

আমি আরও কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তা এই বয়সেও এতো তারুণ্যের রহস্যটা কী?‘

উনি পাঞ্জাবির উপর দিয়ে বুকের বাঁ দিকটায় হাত রেখে বললেন,‘ রহস্যটা এইখানে।‘

আমি বললাম,‘অর্থাৎ হার্ট?‘

উনি বললেন,‘ হার্ট তো নিশ্চয়ই, তবে হৃদপিণ্ড নয়, হৃদয়। বুঝলেন?‘

আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মাথা নেড়ে বললাম,‘না, বোধগম্য হলো না।‘

          উনি পাঞ্জাবির বাঁ দিকের বুক পকেটের ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে দেখিয়ে বললেন,‘রহস্যটা এখানেই লুকিয়ে আছে।‘

আমি ভাবলাম, এ নিশ্চয়ই কোন বড় ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন হবে।তাই দেখার জন্য আগ্রহের সঙ্গে হাত বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু উনি ‘টপ সিক্রেট‘ বলে কাগজটা ওনার পাঞ্জাবির পাশ পকেটে ঢুকিয়ে দিলেন। ওঁর এহেন আচরণে আমি খুব অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। ভাবলাম, ডাক্তারের নাম, ঠিকানা আমি জানলে ওর কী এমন অসুবিধা হতো। আমারও জেদ বেড়ে গেল, যে করেই হোক, কাগজটা দেখতে হবে। ওঁকে পটাতে প্রসঙ্গ বদল করে বললাম, ‘আসুন, একটু চা হয়ে যাক।‘

         রেস্টুরেন্টের বয়কে হাতের ইশারায় ডেকে দু’কাপ চা দিতে বললাম।চায়ে চুমুক দিতে দিতে নানা কথা আলোচনার মাঝে চেয়ারটা ওর আর একটু কাছে সরিয়ে বসলাম। এখন আর হাত সাফাইয়ের অসুবিধা নেই। কাগজটা ওর পকেট থেকে আমার পকেটে ঢুকে গেল। (পরে অবশ্য ‘কুড়িয়ে পেয়েছি‘ বলে ওর কাগজ ওকে ফেরত দিয়ে দিয়েছি।)

বাকী চা-টা এক চুমুকে শেষ করেই প্রকৃতির ডাকের অজুহাতে উঠে সোজা আমার কটেজে ঢুকে পড়লাম।

দরজা বন্ধ করেই কাগজটা খুলে দেখলাম। আর যা দেখলাম,তা‘ শেয়ার না করে পারলাম না।সেটি একটি প্রেমপত্র — কবিতার ছন্দে লেখা; কোনও এক তেইশ বর্ষীয়া তরুণীর উদ্দেশ্যে অশীতিপর ব্যক্তির নিবেদন।

হুবহু নীচে টুকে দিলাম :–

তোমার এখন তেইশ আর আমি এখন আশি,

আমার মাথায় সাদা চুল, তুমি কৃষ্ণকেশী;

তোমার হাসি মুক্তোঝরা, আমার ফোকলা হাসি

তোমার বুকে উদ্দামতা, আমার বুকে কাশি —

তবুও তুমি বললে আমায়, ‘তোমায় ভালবাসি‘।

ভয় পেও না, যতই বকুক মা অথবা মাসি,

যা চাও পাবে জিন্স-টপ আর গয়না, বেনারসী–

তুমি হবে সবুজ মাঠ, আমি হবো চাষী।

কী বলেছেন তোমার বাবা মিষ্টার পাকড়াশী?

পরোয়া করি না, ডাকুন পুলিশ কিংবা চাপরাশী।

এমন ‘লভ’ তো আকছার করে ইংরেজ, ফরাসী;

বাঙালি বলেই কি দিতে হবে ফুলের বদলে ফাঁসী?

–০–

P27

বই-ল্যাপটপ কথা

P28

P30


পত্রপাঠ

সুভাষ চ্যাটার্জি

জরুরী বিধায় এই লিখিতেছি পত্র,

উত্তর পাঠায়ে দিবা পত্রপাঠ মাত্র।

তব তরে দেখিয়াছি দুইখান কনে,

পত্রপাঠ জানাইবা চাও কোন্ জনে।

একজনে হইল বেঁটে,মোটা,কালো

অন্যে লম্বা,রোগা, রং তার ধলো।

লিখিতেছি পত্র এই, নাহি তব মাতা;

থাকিলে লিখিতেন তিনি– ইতি তব পিতা।

তব পত্র পাইলাম ডাকে আমি অত্র

উত্তর লিখিতেছি তাই এই মাত্র।

ঠিক ঠিক বাছিয়াছো দুই খান পাত্রী,

দুয়ে মিলে করিবেক কাজ দিবারাত্রি।

একজনে করিব বিয়া, বধূ মোর হবে;

অপরে করিবে তুমি,মাতা মোর তবে।

এক লগ্নে দুই বধূ আসিবেক ঘরে–

এ নিদান রাখিলাম ব্যয়-সংক্ষেপ তরে।

অনেক ভাবিয়া এই লিখিলাম পত্র;

প্রণাম লইও পিতা– ইতি তব পুত্র।

—০—

P31

SS2

কুসংস্কার

সুভাষ চ্যাটার্জি

      বেশ কয়েকদিন একটানা পূজোর ছুটির পর আজই প্রথম অফিস খুলছে। এ ক‘দিন দেরী করে বিছানা ছেড়ে ওঠার অভ্যাসে আজও উঠতে দেরী হয়ে গেল। যাই হোক, অফিস তো যেতেই হবে,  তাই কোন রকমে রেডি হয়ে খেতে বসেছি । দরজায় কলিং বেল বেজে উঠলো।মা দরজাটা খুলতেই সুমিত হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকেই চেঁচিয়ে উঠল,‘‘কিরে, তুই এখনো রেডি হোস নি! আজ নির্ঘাত লেট‘‘।

      সুমিত আমার ছোটবেলার বন্ধু।দু‘জন এক পাড়াতে একসঙ্গে বড় হয়েছি। স্কুলে এক ক্লাসে পড়তাম। এখন এক অফিস পাড়ায় আলাদা অফিসে চাকরি করি; কয়েকটা বাড়ী আগে পরে। একসঙ্গে গল্প করতে করতে অফিস যাই। আমার ঠাকুমা তো বলেন, ‘‘তোদের দুজনের শ্বশুরবাড়িও এক পাড়ায় হবে।‘‘

       আমি গোগ্রাসে ভাত ক‘টা গিলে কোনোরকমে মুখ ধুয়ে পায়ে জুতো গলিয়ে তাড়াহুড়ো করে বেরোতে যাব, ডাইনিং টেবিলের কোনায় একটা জোর ধাক্কা খেলাম।আমি বেরোবার সময় ঠাকুমা দুর্গা নাম জপতে জপতে এসে দাঁড়ান।তিনি বললেন,‘‘বাধা পড়েছে, একটু বসে যাও দাদুভাই।‘‘ আমি একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। সুমিত মুখে কিছু না বলে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করতে লাগলো।

        সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সুমিত বলল,‘‘আজ লেট হলে তুই আমাকে ফাইন হিসেবে টিফিনে মোগলাই খাওয়াবি।‘‘ আমি বললাম,  ‘‘অত চিন্তা করিস না। ট্যাক্সি ধরে নেব।পুরো ভাড়া আমি দেব। তাছাড়া,  টিফিনে মোগলাইটাও উপরি থাকবে।‘‘

         রাস্তায় ভীড় কম। সহজেই ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম। সুমিত ট্যাক্সিতে উঠেই আমার পিছনে লাগা শুরু করলো।বলল,‘‘ঠাকুমার ঐসব বাধা-টাধা তুই বিশ্বাস করিস?‘‘  ও কী-সব যুক্তিবাদী সমিতি-টমিতি করে। আমি বললাম,‘‘ দেখ, ঘরের মধ্যে টেবিলে ধাক্কা খাওয়ার মানে হল, আমার মনটা তখন এতটাই চঞ্চল যে, আশপাশের যে সব জিনিসের অবস্থান আমার সম্পূর্ণ নখদর্পণে এবং তার কোন বদল ঘটে নি, সেগুলো সম্বন্ধেও আমি অসচেতন,তাই আমি তাতেও ধাক্কা খেলাম। এই অবস্থায় রাস্তায় বেরোলে গাড়ীতে ধাক্কা খেয়ে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা অনেক বেশি, কারণ সেগুলোর অবস্থান তো অহরহ বদলাচ্ছে।তাই, এই পরিস্থিতিতে একটু বসে মনটা শান্ত করে বেরনোই উচিত।‘‘

           সুমিত বলল, ‘‘ তুই কি হাঁচি-টিকটিকির বাধাও মানিস?‘‘  আমি কোনো উত্তর দিলাম না। আমাকে বেশ জব্দ করেছে ভেবে সুমিত নিশ্চিন্তে ঠোঁটে একটা সিগারেট লাগালো।  আমি ধূমপান করি না। পকেট থেকে নস্যির কৌটো বের করে আঙুলে এক টিপ নস্যি নিলাম।সুমিত লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেটের কাছে নেওয়া মাত্র আমি ওর নাকের কাছে নস্যিটা ধরলাম। সুমিত তাড়াতাড়ি লাইটার নিভিয়ে জোরে একটা হাঁচি দিল।তারপর বলল, ‘‘পুড়িয়ে মারবি নাকি?‘‘  আমি বললাম,‘‘সিগারেটটা ধরালি না কেন? তাহলে তুইও হাঁচির বাধা মানিস?‘‘  সুমিত কি বলবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে আমার দিকে চেয়ে রইল। আমি বললাম, ‘‘আগুনের কাজ করার সময়, বঁটির মতো ধারালো জিনিসে কিছু কাটার সময়, গাড়ী চালানোর সময় বা বিপদ ঘটতে পারে এরকম কিছু করার সময় হাঁচি পেলে কাজ বন্ধ করা উচিত।না হলে বিপদ হতে পারে। এ ধরনের কাজের লিষ্ট দেখে তো কেউ মানবে না, তাই খনার বচনে সাধারণ ভাবে হাঁচির বাধা বলা হয়েছে।‘‘

সুমিত মজা করে বলল,” তুই যে সরস্বতী পুজোর আগে কুল খেতিস না পরীক্ষায় ফেল করার ভয়ে, সেটার পিছনেও কি যুক্তি আছে?” আমি বললাম, “অবশ্যই আছে। দেখ, সরস্বতী পুজো মাঘ মাসে হয়। কখনো মাঘ মাসের প্রথমে, কখনো শেষে। অর্থাৎ পূজোর আগে কখনো কুল কাঁচা থাকবে, কখনো বা পাকা। কাঁচা কূল খেলে গলায় ব্যথা হয়ে শরীর খারাপ হতে পারে। তার ফলে পড়াশুনারও ব্যাঘাত ঘটবে। আবার পরীক্ষার মধ্যে হলে পরীক্ষা দিতেও বাধা পড়তে পারে।ফলে পরীক্ষার ফল খারাপ হতে পারে, পরীক্ষায় ফেল করতেও হতে পারে। তাই, কাঁচা  কুল খাওয়া এড়ানোর জন্য সরস্বতী পুজোর আগে কুল খাওয়া নিষেধ আছে।”

        ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি বেশ জোরেই চলছিল, হঠাৎ জোরে ব্রেক কষল। ‘‘কি হলো ড্রাইভার দাদা?‘‘

         ‘‘বিড়ালে রাস্তা কেটেছে।‘‘ অর্থাৎ, রাস্তা পার হচ্ছে। ড্রাইভাররা এই সময় গাড়ি থামিয়ে দেয়। সুমিত বলল,‘‘এই কুসংস্কারের তুই কি ব্যাখ্যা দিবি?‘‘  আমি বললাম,‘‘যুক্তি দিয়ে বিচার না করে সব কিছু কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। বিড়াল খুব ভীতু প্রাণী। পিছনে কেউ তাড়া করলে ওরা এরকম দৌড়ায়। সুতরাং, একটা সম্ভাবনা থেকে যায় যে, যখন ও  ওইভাবে রাস্তা পার হচ্ছে, ওর পিছনে কেউ দৌড়ে আসছে– মানুষ বা কুকুর। তাই, দুর্ঘটনা এড়াতে গাড়ি থামিয়ে দিল।‘‘

         আর বেশি যাওয়ার আগে রাস্তায় ভীড় চোখে পড়ল। সামনে জটলা।সব গাড়ি ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।মোড়ের মাথায় একটা বড় বট গাছ। তার নীচে সিঁদুর মাখানো একটা বড় পাথর। সেখানে ধূপ-ধুনো দিয়ে পূজো চলছে।তাই ভক্তদের ভিড়। সুমিত বলল,‘‘এটাকেও কি তুই কুসংস্কার বলবি না?‘‘  আমি বললাম,‘‘এখন তো এটা একটা ব্যবসা। কিন্তু হাজার বছর আগে এর প্রচলন কেন হয়েছিল ভাবতে পারছিস? আধুনিক মানুষ জানে গাছের কত উপকারিতা;তবু তারা গাছ কেটে বন ধ্বংস করছে।আর হাজার বছর আগে মানুষ জানত না, এই সব বিশাল বট, অশ্বত্থ গাছ প্রচুর অক্সিজেন তৈরি করে । কিন্তু অল্প কিছু জ্ঞানী লোক বুঝতে পেরেছিলেন, এই গাছের ফল মানুষের কাজে না লাগলেও মানুষের বাঁচার জন্য এদেরও প্রয়োজন আছে।তাই এগুলোকে কুঠারাঘাত থেকে রক্ষা করতে এদের উপর দেবত্ব আরোপ করে পূজা-অর্চনা শুরু হয়।  মানুষের জ্ঞান যেখানে গাছ রক্ষা করতে পারছে না, সেখানে কুসংস্কার যদি রক্ষা করতে পারে, তাতে ক্ষতি কি?‘‘

আমার যুক্তি খণ্ডন করতে না পেরে সুমিত এবার প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার চেষ্টায় বলল, ‘‘তুই রাজশেখর বসুর লেখা অপবিজ্ঞান প্রবন্ধ পড়েছিস? তাতে উনি লিখেছেন, শাস্ত্রে আছে উত্তর দিকে মাথা রেখে শুতে নেই। আধুনিক কালের শাস্ত্রবিশ্বাসীরা এর ব্যাখ্যা হিসেবে নাকি বলেছেন,  ‘উত্তরে মাথা দিয়ে শুলে পৃথিবীর চুম্বক ক্ষেত্রে উত্তর মেরুর প্রভাবে শরীরের ক্ষতি হয়।’ কিন্তু সেই যুক্তিতে ভূচুম্বকের দক্ষিণ মেরু কেন নিরাপদ হবে তার ব্যাখ্যাটা নেই। তুই কি বলিস?”

       আমি বললাম, “শাস্ত্রের বক্তব্যটা ঠিক, কিন্তু আধুনিক কালের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যার চেষ্টাটা ঠিক নয়। এর কারণ ভূ-চুম্বক তত্ত্বের মধ্যে নেই, আছে আবহাওয়া বিজ্ঞানের মধ্যে। শীতকালে আমাদের দেশে উত্তরে বাতাস বয়ে যায়, তাই উত্তরে মাথা দিয়ে শুলে খোলা জানালা থেকে মাথায় হিম লেগে শরীর অসুস্থ হতে পারে। আর গরম কালে দক্ষিণ দিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হওয়ার জন্য দক্ষিণের খোলা জানালার দিকে মাথা দিয়ে শুলে শরীর শীতল হবে। তার বদলে উত্তরে মাথা দিলে হাওয়ার অভাবে মাথা গলায় ঘাম জমে শরীর অসুস্থ হতে পারে।” সুমিত আমার দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “আমার মত তথাকথিত যুক্তিবাদীরা চিরকাল সনাতন ভারতীয় চিন্তাধারাকে কুসংস্কার ভেবে ভুল করে এসেছে। তুই আমার সেই ভুল ভেঙ্গে দিলি।” আমি ওর পিঠ চাপড়ে বললাম, “অফিস এসে গেছে, তাড়াতাড়ি যা-তোর দেরি হয়ে যাচ্ছে।” 

      কথায় কথায় অফিস পৌঁছে গেলাম। না, দেরী হয় নি। এখনও সাত মিনিট সময় হাতে আছে।

—০০০—

S5

ওনিগেট

(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

সুভাষ চ্যাটার্জি

     গ্রামের চৌমাথায় হারু মাষ্টারের বাসার সামনেই গ্রামের লোকদের একটা জটলা। কিছুক্ষণ আগেই পুলিশের গাড়ি এসে হারু মাষ্টারকে নিয়ে গেছে। সেই নিয়ে আলোচনা চলছে।

     একজন বললে,‘আহা, হারু মাষ্টার নোক বড় ভালো ছিল গা। সে নোক এমন কী করলে যে পুলিশে নে গেল?’

     ‘শুনলাম তো মাষ্টার নাকি  ওনিগেট হইছে।’

     ‘ সেটা আবার কি গা? কোন্ পাটি? ইটা তো কুনোদিন শুনি নাই। জঙ্গল পাটি শুনছি; লাল, লীল, হলুদ– কত্ত রঙের পাটি। ইটা আবার কোন্ রঙের গা?’

     ‘ আমি কি আর অত্তসব জানি ? আমি বাপু মুখ্যু সুখ্যু মানুষ। অই তো হেডমাস্টরটা ইদিক পানেই আইসছে, তা উয়ারেই জিগাও না।’

      হারু মাষ্টারের প্রাথমিক স্কুলের হেডমাস্টার এসে পৌঁছাতেই তাকে চারপাশ থেকে সকলে ঘিরে ধরে।

      ‘আজ্ঞে, আপুনি আমাদের বলেন তো হারু মাষ্টরের দোষটা কী।সে নাকি ওনিগেট পাটি ছেল? পুলিশ তাকে ধরলে কেন?’

হেডমাস্টার চারদিকে একবার দেখে নিয়ে বললেন,‘ এদের নিয়ে তো মহা মুস্কিলে পড়লাম। কী করে যে বোঝাই! আরে বাবা, সে সব পার্টি-ফার্টি কিছু না। পুলিশ হারুবাবুকে অ্যারেস্ট করে নি।ওকে সম্মানের সঙ্গে পৌঁছে দিতে গেছে।’

      ‘তবে যে শুইনলাম, মাষ্টর ওনিগেট হইছে?’

       ‘আরে বাবা, ওনিগেট না, ওনিগেট না; কথাটা হলো গিয়ে ‘ও নেগেটিভ’।ওটা কোন পার্টি না; ওটা হচ্ছে, হারু বাবুর রক্তের গ্রুপ, মানে ধরণ।’

       ‘ তার মানে কি হারু মাষ্টরের রক্ত আলাদা? আমাদের মতো লাল লয়?’

       ‘ আ-হা-হা, তা কেন হবে? রক্ত তো সকলেরই লাল।তবে তার মধ্যেও আলাদা আছে। কারো অ্যাক্সিডেন্ট বা অপারেশন হলে হাসপাতালে তো রক্ত দেয়।তা  সবার রক্ত কি সবাইকে দেয়া যায়?’

       ‘ঠিক, ঠিক। মোড়লের ছেলাটার অ্যাক্সিডেন্টের পরে হাসপাতালে যখন আমরা রক্ত দিতে গেলাম, তখন ওরা তো বেছে বেছে যার রক্ত মিল হইছিলো, তারটাই নিছে।’

       ‘হ্যাঁ, এটাই আসল কথা। হারু মাষ্টারের রক্ত হলো গিয়ে ও নেগেটিভ। ওর রক্ত দিল্লীর এক বড় মন্ত্রীর রক্তের সাথে মিলে গেছে। দেশের মন্ত্রী বলে কথা! তাঁর জীবনের কত দাম! আবার বিপদও কম নাকি? কত শত্রু আছে। এখানে ওখানে যেতেও তো হয়। হারুবাবুকেও সঙ্গে যেতে হবে।কোন অঘটন ঘটলে প্রয়োজনে রক্ত দিতে হবে।আর না হলে খাও-দাও আর মন্ত্রীর সাথে গাড়ীতে ঘুরে বেড়াও।’

       ‘তা ইটা কি একটা চাকরি হোলো? ইয়ার জন্যি টাকা পাবেক?’

       ‘তা পাবে না? ‘মাষ্টারীর থেকে অনেক বেশি টাকাই পাবে। খাতিরও বেশি পাবে, মন্ত্রীর কাছের লোক বলে কথা।’

      ‘সে নয় বুইঝলাম।কিন্তুক ইটা কি করি জানা গেল যে গোটা দেশে হারুমাষ্টর আর মন্ত্রীর রক্ত এক? আর আমাদের এই ছোট্ট গাঁয়ের মধ্যি থেকে উয়ারা মাষ্টারকে খুঁজে পাইল কেমনে?’

      ‘ঠিক কতা, ঠিক কতা।’

      ‘আরে বাবা, ক‘দিন ধরেই তো সরকার থেকে রেডিওতে প্রচার চলছিল। ও নেগেটিভ রক্তের লোকদের যোগাযোগ করতে বলা হয়েছিল।জোয়ান বয়স, সুঠাম স্বাস্থ্যও তাদের থাকতে হবে। তা হারুবাবুর সেসবই ছিল।আগে রক্তদানও করেছে; তাই রক্তের গ্রুপও জানত।ব্যস, রেডিও থেকে ফোন নম্বর নিয়ে নিজেই যোগাযোগ করেছে।’

     ‘কিন্তুক মাষ্টরবাবু, একখান কতা। মন্ত্রীর যদি এদিক ওদিক কিছু হয়ি যায়,তকন  কি হবে?’

     ‘তখন হারুবাবু আবার এখানে চলে আসবে। ওর স্কুলের চাকরি তো ধরাই আছে। চাকরি তো চলে যায় নি। শুধু যতদিন মন্ত্রীর কাছে থাকবে, স্কুল থেকে মাইনে পাবে না।ওর জায়গায় ততদিন অন্য কেউ কাজ করবে।’

তো এই হোল হারু মাষ্টারের আজকের গল্প।

       দু’পাশের আদিগন্তবিস্তৃত সবুজ মাঠের বুক চিরে কালো পিচের রাস্তায় দুরন্ত গতিতে  ছুটে চলেছে পুলিশের জীপ হারাধন ঘোষ ওরফে হারু মাষ্টারকে সওয়ারী করে। সঙ্গী পুলিশ কর্মীরা শশব্যস্ত, যাতে হারু মাষ্টারের বিন্দুমাত্র অসুবিধা না হয়।হারু উদাস চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। দু’পাশের মাঠঘাট, গাছপালা ক্রমশঃ পিছনে সরে সরে যেতে থাকে।তার সঙ্গে তার মনটাও ক্রমশঃ পিছোতে থাকে। মায়ের কথা, বাড়ীর কথা বেশি করে মনে হতে থাকে। মধ্য কোলকাতার ঘিঞ্জি পাড়াটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ছোটবেলায় গলির ভেতর ক্রিকেট খেলা, তারপর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারা– বেশ কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। পড়াশোনায় তেমন ভালো না হলেও খেলাধূলায় বন্ধুদের মধ্যে সেরা ছিল। বন্ধুরা হারুকে বলত হিরো। মেঘে মেঘে যেমন বেলা বাড়ে,সেরকম করে বয়সটাও আস্তে আস্তে বেড়ে  গেল। বন্ধুরা সব চাকরি জোগাড় করে এদিক সেদিক চলে গেল। কিন্তু, কী আশ্চর্য! হারুর ভাগ্যে আর শিকে ছেঁড়ে না। বন্ধুরা ছুটিতে বাড়ি এলে হারুর সাথে দেখা হয়। ওরা ঠাট্টা করে হারুকে বলে,‘খেলার মাঠের হিরো চাকরীর বাজারে হেরো হয়ে গেল!’ কেউ ফোড়ন কাটে,‘‘হিরো থেকে জিরো!”। কেউবা বলে,‘হারু হীরে ধারণ কর, তবে যদি ভাগ্য ফেরে’। হারু নীরবে সব সহ্য করে।ও কী করবে ভেবে পায় না।ও নিজেও জানে, ও পড়াশোনায় তত ভালো না। খুব বড় চাকরি ওর জুটবে না। তাই প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপন বেরোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু,কি এক অজানা কারণে হয়ে হয়েও হয় না। শেষমেষ তিন বারের চেষ্টায় হলো, কিন্তু পোষ্টিং পেল বাড়ী থেকে তিন শো কিলোমিটার দূরে এই গণ্ডগ্রামে। স্কুল ছুটির পর অখণ্ড অবসর। নিজের খাওয়ার ব্যবস্থা তাই নিজেই করে। তারপর, রেডিও চালিয়ে গান, খবর শোনা।

         অবশেষে, এই সরকারী ঘোষণা শোনামাত্র হারুর মনে হোল, এইবার হয় তো তার ভাগ্যের দরজা খুলবে।দেরী না করে বিজ্ঞাপনের ফোন নম্বরে যোগাযোগ করে ফেলে। তারপর সদর হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ডাক। স্বপ্নের মতো ক’টা দিন কেটে গেল; আর আজ সে ছুটে চলেছে নতুন দিনের সন্ধানে– যার অপেক্ষায় সে এতদিন বসেছিল।

        এই মুহূর্তে মায়ের কথা হারুর খুব মনে পড়ছে। একবার মায়ের সাথে ফোনে কথা বলা দরকার। কিন্তু মাকে বলা যাবে না যে, রক্ত দেওয়ার চাকরি পেয়েছে সে। মা শুনলে ভয় পেয়ে যাবে। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে মাকে ফোন করে হারু।ওপাশ থেকে মায়ের গলা শুনতে পেলো,‘কিরে, এমন অসময়ে ফোন? শরীর ভালো আছে তো?’

       ‘হ্যাঁ মা, ভালো আছি। তোমাকে একটা খবর দেওয়ার ছিল, আমি এখন দিল্লী যাচ্ছি।’

      ‘কেন রে? হঠাৎ দিল্লী কেন?’

      ‘একটা নতুন চাকরিতে যোগ দিচ্ছি। মন্ত্রীর এসিস্ট্যান্ট।’

      ‘ওসব রাজা-মন্ত্রী শুনেই তো ভয় লাগছে।কাজটা ভালো তো? দেখিস বাবা।’

      ‘আরে, না,না – ভয়ের কিছু নেই।তবে হয়তো অত শিগগির বাড়ী আসতে পারব না। চিন্তা কোরো না। দিল্লী পৌঁছে আবার ফোন করব।’

      দিল্লী পৌঁছে হারু দেখল সুন্দর, ছোট, সাজানো এসি ফ্ল্যাটে তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। মন্ত্রীর বাড়ী থেকে খুব বেশি দূরে নয়। মন্ত্রী দিল্লীতে থাকলে সে নিজের ঘরেই থাকতে পারে; আশেপাশে কোথাও যেতে হলে জানিয়ে যেতে হবে।তবে মন্ত্রীর দপ্তরে হাজিরা দিলে দুপুরের খাবারটা ফ্রিতে হয়ে যাবে। ব্যাপারটা মন্দ নয়। আরামের চাকরি।

      মন্ত্রীর অফিস, বাংলোয় আসা-যাওয়া করতে করতে অফিসের লোকজন, নিরাপত্তা কর্মী ও অন্যান্যদের সঙ্গে হারুর বেশ ভালই আলাপ-পরিচয় হয়ে গেল। এখন আর কথায় কথায় পাশ, পরিচয় পত্র দেখাতে হয় না।

       এমনি করেই দেখতে দেখতে একটা বছর পার হয়ে গেল। মন্ত্রীর কোন মারাত্মক অসুস্থতা হয় নি।হারুরও এই এক বছরে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে নি। সামনে দূর্গা পূজো; হারুর মনটা বাড়ী ফেরার জন্য উসখুস করতে থাকে। ছুটির জন্য সেক্রেটারির কাছে একটা দরখাস্ত জমা দিল।উনি বললেন, ‘‘দাঁড়াও ভাই, আগে স্যারের প্রোগ্রামগুলো দেখে নি।” তারপর কাগজপত্র ঘেঁটে বললেন,‘‘তোমার  পূজোর আগে আগে স্যার ফরেন ট্যুরে যাবেন; ফিরবেন দেওয়ালির আগের দিন”।হারু কাঁচুমাচু মুখে বলল,‘‘ তাহলে কি আমি ছুটি পাব না?” সেক্রেটারি অভয় দিয়ে বললেন,‘‘আহা পাবে না কেন? বিদেশের হাসপাতালে সব রকম রক্তের উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকে। তোমার রক্তের কোন প্রয়োজন হবে না।তুমি ঐ সময় ছুটি নিতে পারবে। আমি মঞ্জুর করে দেব।” হারু যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেল।

        পূজোর এখনও প্রায় দু‘মাস বাকী। কিন্তু আনন্দের আতিশয্যে হারু তাড়াতাড়ি মাকে ফোন করে বলল,‘‘ মা, পূজোয় বাড়ি আসছি।বাবাকে বলো যেন সিমেন্ট, বালির দোকানে কথা বলে মিস্ত্রী লাগিয়ে বাড়ির যেখানে যা দরকার সারিয়ে নেয়। আমি গিয়ে সব টাকা দোকানে দিয়ে আসব। আর পূজোর আগে ঘরগুলো সব রং করে নিও।আর শোনো, পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে বলবে, আমি আসছি।”

        মুখে মুখে পাড়ায় খবর ছড়িয়ে গেল, হারু পূজোয় বাড়ি আসছে।

পাড়ার ক্লাবের মাতব্বরদের মধ্যে হারুর কয়েকজন বন্ধুও আছে। তারা বলল, ‘‘হারু তো এখন পাড়ার ভিআইপি। ওকে একটা গ্র্যান্ড রিসেপশন দিলে কেমন হয়? ঠাকুর বিসর্জনের পর তো প্যান্ডেলটা খালিই থাকবে l” সিদ্ধান্ত নেয়া হল, বিজয়া দশমীর পর দিন হারুকে সম্বর্ধনা দেওয়া হবে।

       পঞ্চমী পূজোর দিন হারু কোলকাতায় এলো।পাড়াটা পুজোয় বেশ জমজমাট চেহারা নিয়েছে। নতুন রঙ করা হারুদের বাড়িটা দূর থেকেই বেশ ঝকঝক করছে।হারু মা-বাবা দু‘জনকেই চমকে দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। ঘরগুলোও নতুন রঙে চকচক করছে।বাড়ীতে হৈ হৈ পড়ে গেল।মা আজ ওর পছন্দের আলু পোস্ত, মৌরলা মাছের ঝাল রান্না করেছে। হারু স্নান-টান সেরে খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে পড়ল।বন্ধুরা যারা বাইরে চাকরি করে, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ পূজোয় বাড়ি এসেছে।সবাই মিলে বেশ জমাটি আড্ডা হল।

        পূজোর কটা দিন বাড়িতে,পাড়ায় হৈ-হুল্লোড়ে কাটল।একাদশীর সন্ধ্যায় খালি পূজামন্ডপে হারুর সম্বর্ধনার আয়োজন হয়েছে।বিকেল তিনটে থেকে মাইকে ঘোষণা চলছে।বন্ধুরা হারুকে বলল, ‘‘ভালো করে সেজেগুজে আসবি”। হারু সলজ্জভাবে বলল,‘‘একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?” কিন্তু ওর কথায় কেউ গুরুত্ব দিল না।

        সন্ধ্যে সাতটায় অনুষ্ঠান শুরু হল। হারু, ওর বাবা-মা, পাড়ার বন্ধুরা, কচিকাঁচা ও অন্যান্য পরিচিতরা দর্শকাসনে হাজির।পাড়ার ছোট্ট একটি মেয়ে উদ্বোধনী সঙ্গীত গাইল।ক্লাবের সেক্রেটারি হারুকে মঞ্চে ডেকে নিলেন। সেক্রেটারি তার ভাষণে বিগলিত হয়ে বললেন,‘‘ হারু আমাদের পাড়ার গর্ব।হারু আজ শুধু হীরো নয়, হীরে হয়ে আমাদের মধ্যে এসে আমাদের ধন্য করেছে।” হারু অবাক হয়ে ভাবতে লাগল,‘‘ চাকরি পাওয়ার আগে আমার বেকার দশাকে এরাই বিদ্রুপ করে আমাকে ডাকতো হেরো !” অনুষ্ঠান শেষে হারুর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য সকলের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল।

         দেখতে দেখতে হারুর ছুটির দিনগুলো শেষ হয়ে গেল। হারু আবার দিল্লি ফিরে গেল। মন্ত্রী মশায়ও ফিরে এলেন। আবার গতানুগতিক সব কিছু চলতে লাগল। কিন্তু বিধাতা পুরুষ বোধহয় হারুর কপাল লিখন অন্য রকম লিখেছেন।

        মন্ত্রীর গাড়ী এক প্রচণ্ড দুর্ঘটনায় পড়ল। পাশের রাস্তা থেকে এসে একটি বড় গাড়ি দুরন্ত গতিতে মন্ত্রীর গাড়িতে ধাক্কা মারল।মন্ত্রী সাংঘাতিক আহত হলেন। কনভয়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্স সাথে সাথেই মন্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। হারু ও আর একজন রক্তদাতাকেও অন্য গাড়ীতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। হাসপাতালে হারুর রক্ত নেওয়া হল। কিন্তু সে রক্ত আর মন্ত্রীকে দেওয়ার সুযোগ হল না। মন্ত্রীর জীবনদীপ নির্বাপিত হল। একই সাথে হারুর দিল্লির চাকরির মেয়াদও শেষ হয়ে গেল।

        প্রায় তিন বছর বাদে হারু আবার চলেছে সেই গণ্ডগ্রামে, যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হারু মাষ্টার প্রথম চাকরি জীবন শুরু করেছিল।হাইওয়ে ধরে হারুর বাস ছুটে চলেছে সেই ছোট্ট অখ্যাত গ্রামের দিকে। হারুর মনে হল যেন দু‘পাশের ঘন সবুজ গাছপালাগুলো ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।হারু বাস থেকে নেমে হেঁটে আসতে আসতেই চারপাশের আকাশ বাতাস কচিকাঁচাদের উল্লাস ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল,‘‘হারুমাষ্টার ফিরে এসেছে”।

        দিল্লির কোলাহল ও দূষণ থেকে অনেক অনেক দূরে গ্রামের শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে শান্তিপ্রিয় মানুষগুলোর মধ্যে ফিরে এসে গ্রামের নির্মল বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে হারু মাস্টারের মনে হল, “উঃ, কি শান্তি !” ।

—০০০—

P36

P37

P38

P39

P40

P41

P42

P43

P44

P45

P46

P47

P48

P49

P50

P51

P52

P53

P54

P55

P56

P57

P58

P59

P60

P61

P62

P63

P65

P66

P67

P69

P70

P71

P72

P73

P75

P76

P77

P78

P79

P80

P82

P83

P84

P85

P86

P87

P88

P89

P90

P91

P92

P93

P94

P95

P96

P97

P98

P99

P100

P101

P102

P103

P104

P105

P106

P107

Screenshot

P108

P109

P110

P111

P112

P113

P114

P115

P116

P117

P118

P119

P120